ইং ১৯৩৩ সনের কোন এক মহেন্দ্র ক্ষনে খ্যাতিমান জনদরদী শ্রীযুক্ত রতন কান্ত রায়ের মনের গহিন গহনে অত্র বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। পাশাপাশি খালিয়ার রাজারাম হাইস্কুল ও ননীক্ষির উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারনে রতন কান্ত রায় জলিরপাড়, কলিগ্রাম, বানিয়াচর, বনগ্রাম, আচারপাড়ার বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের নিয়ে একটি সমাবেশ করেন। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন সুধন্য বাকচী, বেচারাম, মনোহর বৈরাগী, গোপাল বালা, ডা: বনমালি বিশ্বাস, কিরন বৈরাগী, ভরত বৈদ্য, মদন মল্লিক, মেঘনাথ রায়, কালিঠাকুর ও গজারিয়ার মন্তাজউদ্দিন মিত্রা সহ অসংখ্য মানুষ।
সভায় রতন কান্ত রায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং সকলকে এগিয়ে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান করেন। এসময় প্রখ্যাত গায়ক নগেন্দ্র নাথ বাড়ৈ রতন কান্ত রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সকলকে উজ্জীবিত করার জন্য একটি সংগীত পরিবেশন করেন যার প্রথম কলি ছিল –
“শান্ত সুধীর মধ্যম মল্লিক
মধ্যম পান্ডব যেন বিরাজে
রতন রায় রূপে।”
তৎপরে উপস্থিত সুধীবৃন্দ জোড়ালো সমর্থন করেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ প্রসঙ্গে বিদ্যালয় কোথায় স্থাপিত হবে? কে বা কাহারা ভূমি দান করবে? এ উক্তির প্রেক্ষিতে ভীমসেন মল্লিক পুত্র প্রভাষ মল্লিক ও জোগেন্দ্র মল্লিক বিদ্যালয়ের জন্য ভূমি দান করার কথা সর্বসমক্ষে ব্যক্ত করলে সকলের মনোবল উন্নত হয়।
পরবর্তী দিন থেকে পালাক্রমে প্রত্যেক গ্রাম থেকে পরিবার ভিত্তিক ধান সংগ্রহ শুরু হয়। অনেকে কাঠের খুটি ও অন্যান্য কাঠ দান করেন। গজারিয়ার মন্তাজউদ্দীন মিত্রা কিছু টিন ও কিছু শালকাঠের খুটি দান করেন। এরপর থেকে গৃহ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথমত একচালা দিয়ে লম্বা গৃহ করে ক্লাস শুরু হয়। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়। বিদ্যালয়ের প্রথম দিকের একজন ছাত্র ললিত মোহন বালা—যিনি এখনও বেঁচে আছেন।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লগ্নে শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখেন বাবু প্রিয়লাল মৃধা, যিনি অত্র এলাকার প্রথম গ্রাজুয়েট ব্যাক্তি। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু ভুবন মোহন বাড়ুলী এবং সহকারী শিক্ষক ছিলেন বাবু রাসমোহন সাহা, বাবু কৃষ্ণচন্দ্র সাহা, কমল কান্ত চক্রবর্তী, মনিন্দ্র নাথ বিশ্বাস, ও লক্ষীনারায়ন গোস্বামী। প্রথম বছরে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৫০ জন।
বিদ্যালয়টি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অগ্রগতি লাভ করে। তৎপরে বাবু রতন রায়ের প্রচেষ্টায় বরিশালের কৃতিসন্তান জননায়ক ব্রিটিশ মন্ত্রী মুকুন্দ মল্লিককে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে অত্র এলাকার পক্ষ থেকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। মন্ত্রী বাহাদুর জনগণের আবেদনে সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সনের ৫ই জানুয়ারি কলিকাতা শিক্ষা বোর্ড অত্র জে,কে,এম,বি, মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়টি অনুমোদন প্রদান করে।
তৎপরে রতন কান্ত রায়ের প্রচেষ্টায় প্রখ্যাত গভর্নর ফিরোজ খান নুন-কে নিয়ে আসেন এবং বিরাট সংবর্ধনা প্রদান করেন। গভর্নর পরবর্তীতে অনেক সহযোগিতা প্রদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৭৫ বছর পেরিয়ে জে,কে,এম,বি মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়টি মুকসুদপুর উপজেলা ও গোপালগঞ্জ জেলার মধ্যে একটি অন্যতম বিদ্যালয় রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমি বলবো:
সেই সে শুভ ক্ষণে,
৫-জানুয়ারি ১৯৩৮ সালে
জ্বেলে দিতে জ্ঞানের আলো
দরদী রতন কান্ত।
ধন্য বাকচী, বেচারাম, মেঘনাথ,
ভীমসেন, গোপাল বালা,
কালু ঠাকুর আরো কতো জন
গড়েছিল এ বিদ্যা নিকেতন।
এসেছিল প্রবাদ পুরুষ মুকুন্দ মল্লিক,
যে সে নয় সে ব্রিটিশ মন্ত্রী!
দিয়ে পূর্ণতা নিলে স্থান মোদের মণিকোঠায়।
আজকে যারা ধরিছ হাল
তোমাদের গড়া এ বিদ্যালয়
দিতে প্রেরণা, শক্তি ও সাহস।
আবার আমি ও ফিরি আমাদের-ই মাঝে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টি একটি দ্বিতল পাকা ভবন, একটি একতলা পাকা এবং আধাপাকা দুইটি ভবন নিয়ে গঠিত। ভবন দুইটি টিনশেডের বাঁধোনো এবং প্রতিটি কক্ষে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আছে। টয়লেট ও জল সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। সর্বোপরি অত্র বিদ্যালয়ে এস.এস.সি ও জে.এস.সি পরীক্ষার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে সুনামের সঙ্গে বিদ্যালয়টি এগিয়ে চলছে।
